
ছুটিতে অনেক এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারছেন না গ্রাহকরা
চলমান ঈদের ছুটিতে ব্যাংকের শাখা বন্ধ। তাই এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার চাহিদা বেশি। কিন্তু টাকা মিলছে না অনেক এটিএম বুথে। ঢাকার বাইরে এ সমস্যা বেশি। ঈদে বাড়ি গিয়ে টাকা উঠাতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মানুষকে।
ঈদকে কেন্দ্র করে এবার ছুটি শেষে অফিস খুলবে আগামী ৬ই এপ্রিল থেকে। গত ২৮শে মার্চ থেকে টানা ৯ দিন বন্ধ রয়েছে। এর আগে ২৬শে মার্চ বিজয় দিবসের ছুটির পরদিন এক দিন ছুটি নিয়ে অনেকে টানা ১১ দিনের ছুটি কাটাচ্ছেন। এই দীর্ঘ ছুটির কারণে এবার গ্রামে গেছেন অনেকেই। টাকা তুলতে ভোগান্তিও বেশি হয়েছে গ্রামে।
অনেক বুথে টাকা নেই। কোনো কোনো ব্যাংকের নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে বুথের সামনে ‘আউট অব সার্ভিস’ লেখা রয়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার সুযোগ বন্ধ রেখেছে। আর নগদ টাকার সংকটে থাকা অনেক ‘দুর্বল ব্যাংক’র বুথে ঈদের আগের দিন থেকেই টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।
ব্যাংকাররা জানান, সাধারণভাবে ঈদকে কেন্দ্র করে নগদ টাকার চাহিদা বাড়ে। টানা বন্ধের মধ্যে শাখা বন্ধ থাকায় বুথ থেকেই চাহিদা মেটানোর চেষ্টা হয়। এ সময় শহর ছেড়ে গ্রামে যান প্রচুর মানুষ। সেই অনুপাতে এটিএম বুথ বা বুথে টাকা রাখার ব্যবস্থা থাকে না। কেননা প্রতিটি বুথের টাকা রাখার নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা থাকে। এ সময় এটিএম বুথের টাকা অন্য সময়ের তুলনায় দ্রুত শেষ হয়ে যায়। অথচ লোকবল সংকটসহ বিভিন্ন কারণে টাকা ফিডিংয়ের (এটিএম বুথে টাকা ঢোকানো) সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এসব কারণে সংকট দেখা দেয়।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক জানান, এটিএম বুথে টাকা ফিডিং করা হয় সাধারণত তৃতীয় কোনো সিকিউরিটি কোম্পানির মাধ্যমে। টানা বন্ধের কারণে সব প্রতিষ্ঠানেই লোকবল সংকট তৈরি হয়। এ রকম অবস্থায় ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই টাকা ফিডিংয়ে আগ্রহী হন না। আবার এ রকম বন্ধের মধ্যে মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়ে যায়। ছুটি শেষে আবার টাকা আসতে শুরু করে। এসব কারণে গ্রামীণ এলাকার শাখায় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, অনেক ব্যাংকের বুথ এখন ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম) বসানো আছে। এসব মেশিনে ব্যবসায়ীসহ অনেকেই বন্ধের মধ্যে নগদ টাকা জমা দেন। এ রকম বুথে টাকা তোলার কোনো সমস্যা হয় না। অবশ্য এ ধরনের বুথ সব ব্যাংকের নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে বর্তমানে টাকা তোলার জন্য বুথ রয়েছে ২০ হাজারের মতো। এর মধ্যে শুধু টাকা তোলার এটিএম বুথ ১২ হাজার ৯৩৮টি। যার মধ্যে শহরেই ৯ হাজার ৯১টি। আর সিআরএম আছে ৭ হাজার ১২টি। এ রকম একই বুথে টাকা জমা ও উত্তোলন করা যায়। যে কারণে এ ধরনের বুথে টাকার সংকট কম হয়। এই সিআরএমও ৫ হাজার ৯টি শহরে আছে। গ্রামে আছে ২ হাজার ৩টি। গ্রামীণ এলাকার বুথ বলতে ঢাকাসহ সব বিভাগীয়, জেলা ও পৌর এলাকার বাইরে স্থাপিত বুথকে বোঝানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি মাসে এটিএম ও সিআরএমে মোট ৩৮ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে এটিএম বুথের মাধ্যমে ২২ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আর সিআরএম থেকে ১৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চের তথ্য পাওয়া যাবে আরও পরে।
তবে গত বছরের ঈদের আগের মাস মার্চে এ দুই উপায়ে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু এটিএম বুথ থেকে ৩২ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা এবং সিআরএম থেকে ১৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকায় সব ব্যাংকের একাধিক এটিএম বুথ রয়েছে। এক বুথে না পেলে অন্য বুথ থেকে টাকা তোলেন মানুষ।
তবে এক ব্যাংকের কার্ড দিয়ে অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার ক্ষেত্রে চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে টাকা তোলার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা চার্জ গুনতে হবে এখন, যা আগে ছিল ১৫ টাকা। প্রথম ৫টি লেনদেনের ক্ষেত্রে (প্রতিবার সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন) আগের মতো ১৫ টাকা চার্জ নেবে। কিন্তু ৫টির পর প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা চার্জ দিতে হবে। গত ২০শে ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন এই নিয়ম কার্যকরের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগ থেকে।
ঢাকার বাইরে উপজেলা পর্যায়ে সব ব্যাংক মিলিয়ে হয়তো বুথ রয়েছে ২-৩টি। ফলে সেখানে সমস্যা হলে টাকা তোলার বিকল্প থাকে না। অবশ্য অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস (মোবাইল ব্যাংকিং) হিসাবে টাকা স্থানান্তর করে তোলার সুযোগ আছে। যদিও এমএফএসে ক্যাশআউট চার্জ অনেক বেশি হওয়ায় অনেকে আগ্রহী নন কিংবা অভ্যস্ত নন। অবশ্য ঢাকার চিত্র ছিল দেশের অন্য এলাকার চেয়ে ভিন্ন।
ঢাকার খিলগাঁওয়ের শহিদ বাকি সড়কে দেশের প্রধান ব্যাংকগুলোর ২০টির বেশি এটিএম বুথ রয়েছে। এর মধ্যে ঈদের টানা ছুটির মধ্যে ৩-৪টি ছাড়া সব বুথে নির্বিঘ্নে টাকা তোলা গেছে। শুক্রবার খিলগাঁও তালতলা সিটি সুপারমার্কেটের পাশে বাটা শুর শোরুম লাগোয়া একটি ভবনে দ্বিতীয় প্রজন্মের তিন ব্যাংকের পৃথক তিন এটিএম বুথের মধ্যে দুটি বন্ধ পাওয়া যায়। একটি বুথের সামনে নোটিশ টানানো ছিল ‘প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এটিএম পরিষেবা বন্ধ আছে’।
এ বুথের নিরাপত্তারক্ষী পরশ দাশ জানান, এটিএমে টাকা আছে; কিন্তু নেটওয়ার্ক সমস্যাজনিত কারণে ঈদের দিন থেকে কেউ টাকা তুলতে পারেননি। একই ভবনের অপর একটি ব্যাংকের এটিএম বুথে ঈদের আগের দিন থেকে টাকা নেই বলে ওই বুথের নিরাপত্তারক্ষী বাবুল জানান।